আর নবায়নযোগ্য জ্বালানির ইনস্টল ক্যাপাসিটি রয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ৩০ শতাংশের মতো। বিপরীতে বাংলাদেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ইনস্টল ক্যাপাসিটি ৪ শতাংশের মতো; আর উৎপাদন আড়াই শতাংশের মতো। সে জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করতে পৃথক বিশেষ মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে গতকাল নবায়নযোগ্য জ্বালানি-সংক্রান্ত এক সংলাপে এ প্রস্তাব দেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
‘আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ’ শীর্ষক এ সংলাপটি যৌথভাবে আয়োজন করে সিপিডি ও অনলাইন গণমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিম। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মনজুর হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা রিতু, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং গবেষণা ও উন্নয়ন পরিদপ্তরের পরিচালক মনিরুজ্জামান, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মো. হাতেম, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর মোর্শেদ। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট খালিদ মাহমুদ এবং স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ।
আলোচনায় ইউআইইউর সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘সারা বিশ্বের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা হচ্ছে ১০ টেরাওয়াটের মতো। নবায়নযোগ্যের সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে আমরা বিদ্যুৎ পাই ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৪ শতাংশের মতো ইনস্টল ক্যাপাসিটি। সেই হিসাবে সারা বছর আমরা ২ থেকে আড়াই শতাংশ বিদ্যুৎ পাই নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। পৃথিবীতে ইনস্টল ক্যাপাসিটি যেখানে ৫০ শতাংশের মতো, আমাদের সেখানে মাত্র ৪ শতাংশ। আমরা কতটা পিছিয়ে একটি পরিসংখ্যানেই তা স্পষ্ট।’
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমরা এতদিন যত বাজেট পেয়েছি, সেটি ছিল জীবাশ্ম জ্বালানির বাজেট। জীবাশ্ম জ্বালানির চাপে নবায়নযোগ্য জ্বালানি চিড়েচ্যাপ্টা হয়েছিল। বিগত বাজেটের এডিপিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ ৪ শতাংশের ওপরে যায়নি। সেজন্য আগামী বাজেটে আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) একটি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এ কাঠামো দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপুল জনপ্রত্যাশা মেটানো কষ্টকর। সেজন্য পৃথক বিশেষায়িত কোনো মন্ত্রণালয় করা যায় কিনা, সেই প্রস্তাব রাখছি।’
পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন কৌশলপত্র তৈরি করা হচ্ছে জানিয়ে কমিশনের সদস্য ড. মনজুর হোসেন বলেন, ‘সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়টি রয়েছে। সোলার এনার্জির ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আছে। সরকারের একার পক্ষে এটি করা সম্ভব নয়। বেসরকারিভাবে করার ক্ষেত্রেও এটি অনেক ব্যয়বহুল, ফলে এখানে ইনসেনটিভের বিষয় রয়েছে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বলতে সোলার বিদ্যুৎ বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, পাশাপাশি আমাদের কৃষিজমিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, জমি আমাদের সীমিত। সেজন্য কৃষির উৎপাদন নষ্ট করে যেন এসব প্রকল্প না করা হয়, সেটিও মাথায় রাখতে হবে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘জ্বালানি খাতের ক্ষেত্রে আমরা মূলত একটি ‘দুষ্টচক্রের’ মধ্যে আটকে আছি। এ সংকটকে যদি আমরা মোটা দাগে তিনটি ভাগে বিভক্ত করি, তবে প্রথমটি হলো বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা এবং তার প্রকৃত ব্যবহারের মধ্যে বিস্তর ফারাক। এ কারণে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা সক্ষমতার মাশুল হিসেবে জনগণের বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপচয় হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিগত সময়ে এমন কিছু অস্বচ্ছ চুক্তি করা হয়েছে এবং সেগুলোকে আইনি সুরক্ষা বা দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে; যা প্রকৃত ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তৃতীয়ত, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী এবং টেকসই অর্থনীতির জন্য যে ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল, তা চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।’
সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পাঁচটি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, জ্বালানি মিশ্রণে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনুপাত উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াব। দ্বিতীয়ত, আয়ভিত্তিক বৈষম্যহীন মূল্য নির্ধারণ কাঠামো করা হবে। এর আওতায় ভোক্তাদের কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করে একটি ন্যায্য দামের নীতি প্রণয়ন করে সাধারণ গৃহস্থালি ভোক্তা, নিম্ন-আয় ও মধ্যবিত্তদের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হবে। অন্যদিকে শিল্প-কারখানা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য থাকবে ভিন্ন যৌক্তিক কাঠামো। তৃতীয়ত, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্পের বিকাশ। চতুর্থত, দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি। পঞ্চমত, জ্বালানি নিরাপত্তার বেঞ্চমার্ক বা মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে। খাদ্য বা সারের ক্ষেত্রে যেমন নির্দিষ্ট মজুদের মানদণ্ড রয়েছে, ঠিক তেমনি জ্বালানির ক্ষেত্রেও একটি ন্যূনতম আপৎকালীন মজুদ বা ‘বেঞ্চমার্ক’ নির্ধারণ করা হবে।’
এ সময় রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, জ্বালানির দাম সমন্বয়ের পর দেশে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। তবে সরকার যে পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে তার তুলনায় এ সমন্বয় খুব একটা বেশি নয়।